0Shares

নিচে আদালতের রায়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদপত্রের জন্য বাংলায় সম্পূর্ণ নিউজ কপি সাজিয়ে দেওয়া হল। আইনি তথ্য ও আদালতের পর্যবেক্ষণ যথাসম্ভব হুবহু রাখা হয়েছে।

রানিগঞ্জে খোকন মাজি হত্যা মামলায় বিপেন রুইদাসের ৯ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড

মদ্যপ অবস্থায় পাথরের চাকির আঘাতে খুনের অভিযোগ, ৩০২ নয়, ৩০৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত আদালতের

পাবলিক নিউজঃ আসানসোল:-আসানসোল: ২০১৭ সালের রানিগঞ্জের খোকন মাজি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত বিপেন রুইদাস ওরফে বিপিনকে দোষী সাব্যস্ত করে ৯ বছর ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দিল আসানসোলের বিশেষ বিদ্যুৎ আইন আদালত তথা অতিরিক্ত দায়রা আদালত। একই সঙ্গে ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারক অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের আদালত ১ অক্টোবর ২০২৬ এই রায় ঘোষণা করে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ রানিগঞ্জ থানার নিমচা এলাকার বাসিন্দা খোকন মাজির বাড়িতে তাঁর সঙ্গে বিপেন রুইদাসের বচসা হয়। অভিযোগ, সেই সময় বিপেন রুটি তৈরিতে ব্যবহৃত পাথরের ‘চাকি’ দিয়ে খোকন মাজির মাথার বাঁ দিকে আঘাত করেন। গুরুতর আহত হয়ে খোকন মাটিতে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ।

ঘটনার পর পুলিশ বিপেনকে আটক করে। ২ আগস্ট ২০১৭ রানিগঞ্জ থানায় ৩০২ ধারায় মামলা দায়ের হয়। তদন্তের পর বিপেনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করে। ২০২২ সালের জুন মাস থেকে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

এই মামলায় প্রসিকিউশন মোট ১৪ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে। তাঁদের মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশকর্মী, তদন্তকারী আধিকারিক এবং চিকিৎসক ছিলেন। মামলায় কোনও ডিফেন্স সাক্ষী ছিল না।

প্রসিকিউশনের মূল সাক্ষী সুখদেব হেমব্রম আদালতে জানান, খোকন মাজির বাড়ি থেকে চিৎকার শুনে তিনি সেখানে যান। সেখানে খোকন মাজি ও বিপিনের মধ্যে বচসা দেখতে পান। তাঁর দাবি, বিপিন পাথরের চাকি দিয়ে খোকনের মাথায় আঘাত করেন। এরপর খোকন মাটিতে পড়ে যান এবং তাঁর মাথা থেকে রক্তপাত শুরু হয়।

অন্যান্য সাক্ষীদের বক্তব্যেও উঠে আসে, ঘটনার সময় খোকন ও বিপিন দু’জনেই মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। কয়েকজন সাক্ষী আদালতে জানান, বিপিন ঘটনাস্থল থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে ধরে ফেলেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।

তবে মামলায় অস্ত্রের বর্ণনা নিয়ে সাক্ষীদের বক্তব্যে কিছু পার্থক্য ছিল। কোথাও সেটিকে ‘চাকি’, কোথাও ‘রোলিং পিন’ এবং কোথাও ‘শিল-নোড়া’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই বিষয়টি নিয়ে সওয়াল করেন অভিযুক্তের আইনজীবী। আদালত অবশ্য পর্যবেক্ষণ করে জানায়, বিভিন্ন সাক্ষীর বক্তব্যে নামের পার্থক্য থাকলেও সকলের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল অস্ত্রটি পাথরের তৈরি এবং রুটি তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়।

আদালত আরও উল্লেখ করে, ঘটনাটি ২০১৭ সালে ঘটেছিল এবং সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় প্রায় পাঁচ বছর পরে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সাক্ষীদের স্মৃতিতে কিছুটা পরিবর্তন বা অসঙ্গতি থাকা স্বাভাবিক। তাই আদালতের মতে, সেই অসঙ্গতির মাত্রা বিচার করতে হবে এবং শুধুমাত্র ছোটখাটো পার্থক্যের কারণে গোটা প্রসিকিউশন কাহিনি বাতিল করা যায় না।

অভিযুক্তের আইনজীবী আরও যুক্তি দেন, তদন্তকারী আধিকারিক সব সাক্ষীকে পরীক্ষা করেননি এবং ঘটনাস্থলও সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। আদালত স্বীকার করে নেয় যে তদন্তে কিছু ত্রুটি ছিল। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণ, তদন্তকারী আধিকারিকের কোনও ত্রুটি বা গাফিলতি থাকলেই তা মামলার মূল প্রমাণকে অকার্যকর করে দেয় না।

তদন্তকারী আধিকারিক বিজন সামাদ্দার তাঁর সাক্ষ্যে জানান, পুলিশ হেফাজতে থাকা অভিযুক্তের দেখানো জায়গা থেকে ৫ আগস্ট ২০১৭ তারিখে খোকন মাজির বাড়ি থেকে রক্তের দাগযুক্ত পাথরের চাকি উদ্ধার করা হয়েছিল।

মামলায় উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আদালত উল্লেখ করে, চাকিতে থাকা রক্তের দাগ এবং নিয়ন্ত্রণ হিসেবে পাঠানো মাটির নমুনার রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ করা যায়নি, কারণ নমুনাগুলি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবে আদালতের মতে, এই রিপোর্ট প্রসিকিউশনের মামলা শক্তিশালী না করলেও তা মামলাটিকে ধ্বংসও করে না। অন্যান্য বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে শুধুমাত্র নেতিবাচক বা অস্পষ্ট রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্টের কারণে সেই প্রমাণ বাতিল করা যায় না বলে আদালত মন্তব্য করে।

আদালত আরও উল্লেখ করে, ঘটনার সময় খোকন মাজির বাড়িতে খোকন ও বিপিন ছাড়া অন্য কেউ ছিলেন না। বিপিন নিজেও ফৌজদারি কার্যবিধির ৩১৩ ধারায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বীকার করেন যে তিনি খোকনের সঙ্গে ছিলেন এবং দু’জনে মদ্যপান করেছিলেন। তবে খোকনের মাথায় কীভাবে আঘাত লাগল, তার কোনও ব্যাখ্যা তিনি দেননি।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষ্য অনুযায়ী, খোকন মাজির মাথায় যে আঘাত হয়েছিল, সেটিই তাঁর মৃত্যুর কারণ। আদালত সেই মৃত্যুকে ‘অ্যান্টে-মর্টেম’ এবং ‘হোমিসাইডাল’ অর্থাৎ আঘাতজনিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে।

তবে আদালত একই সঙ্গে উল্লেখ করে যে, খোকন ও বিপিন বন্ধু ছিলেন এবং তাঁরা একসঙ্গে মদ্যপান করছিলেন। মদ্যপ অবস্থায় তাঁদের মধ্যে আচমকা বচসা শুরু হয় এবং সেই সময় বিপিন পাথরের চাকি দিয়ে খোকনের মাথায় আঘাত করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খোকনকে হত্যা করার নির্দিষ্ট পূর্বপরিকল্পিত উদ্দেশ্য বা ‘মেনস রিয়া’র প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই পরিস্থিতিতে আদালত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০১ এবং ৩০৪ ধারার বিষয়টি বিবেচনা করে। আদালত জানায়, যদিও বিপিনের বিরুদ্ধে প্রথমে ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু বিচার চলাকালীন প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁকে ৩০৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে এবং এতে অভিযুক্তের কোনও পূর্বাগ্রহ তৈরি হয় না।

এরপর ১ অক্টোবর ২০২৬ আদালত বিপেন রুইদাস ওরফে বিপিনকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে।

সাজা ঘোষণার সময় ক্ষমা প্রার্থনা অভিযুক্তের

সাজার বিষয়ে শুনানির সময় বিপিন আদালতের কাছে দয়া প্রার্থনা করেন। তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে-সহ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি। তাঁর আইনজীবীও আদালতের কাছে তুলনামূলকভাবে লঘু সাজা দেওয়ার আবেদন জানান। অন্যদিকে, সরকারি আইনজীবী সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার আবেদন করেন।

দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত বিপিনকে ৯ বছর ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করার নির্দেশ দেয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

মামলার রায় ও সাজা—দুটিই ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ঘোষণা করা হয়।প্রধান শিরোনামের বিকল্প:
“৩০২ নয়, ৩০৪ ধারায় দোষী—রানিগঞ্জের খোকন মাজি হত্যা মামলায় বিপিনের ৯ বছর ৬ মাস জেল”

0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You missed